বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চাপে অর্থনীতি
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চাপের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি।
তিনি জানান, সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশ, যা ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। পাশাপাশি, মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং দারিদ্র্যের হার সাড়ে ২১ শতাংশে দাঁড়ানোয় অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় তিনি এ কথাগুলো বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
তাসকিন আহমেদ উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী দেশের বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ে কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নামে। তবে সরবরাহ চেইনের সংকট এবং ফ্রেইট পাওয়ার দ্বিগুণ হওয়ার কারণে আমদানিকৃত পণ্যের খরচ অতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এর ফলে স্থানীয় মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে সাড়ে ২১ শতাংশ হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই অবস্থার পাশাপাশি সরবরাহ চেইনের অবনতি ও আমদানির খরচ বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি জানান, ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার জন্য বেশ কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ভেতর নতুন কোম্পানির নিবন্ধন দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মুনাফা বিদেশে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ১০টি নতুন খাতের জন্য শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা চালু করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহজ করার উদ্দেশ্যে মোট ১২৫টি সেবাকে ২৮টি ক্যাটাগরির আওতায় অনলাইনে নিয়ে আসার জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর চূড়ান্ত করা হয়েছে। চামড়া, জুতা, চাল এবং হোম টেক্সটাইল খাতে বন্ডের সুবিধা তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
পাশাপাশি সরকার বাণিজ্য কর ও ডিজিটাল সংস্কারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কর ব্যবস্থাপনায় অনলাইন করপোরেট প্ল্যাটফর্ম, অটোমেটেড ফেসলেস রিফান্ড এবং রিস্ক-বেইজড ডিজিটাল অডিট সিলেকশন চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি এবং ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক সরকারি সেবা এবং দেশের ৯০ শতাংশ এলাকায় ফাইভ-জি সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে একদিনের মধ্যে লভ্যাংশ দেশে ফিরিয়ে আনা, সাত দিনের মধ্যে ব্যবসার অনুমোদন এবং বিদেশি কর্মীদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৬ থেকে ১২ মাসের প্রফেশনাল অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, জাতীয় বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান খরচ সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, কর ও জিডিপির অনুপাত কম থাকায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা চেম্বারের পক্ষ থেকে দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কম সুদে বিদেশি ঋণ ও নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সকে প্রাধান্য দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বর্তমান মুদ্রানীতিতে পলিসি রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে তা মাত্র ৫ শতাংশ, যা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঠিক করে দেওয়া ৪ শতাংশ স্প্রেড, বিশেষ করে সিএসএমই খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি ঋণ গ্রহণ কমিয়ে এনে বেসরকারি খাতের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, উচ্চ সুদের হার এবং সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অর্থায়নের বিকল্প উপায়গুলো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমাতে করপোরেট বন্ড ও সুকুকের বাজার বড় করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তাসকিন আহমেদ আরও বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক খরচ এখনো জিডিপির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে এটি ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতা কমছে।
তার মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা এবং সহজ শর্তে উন্নয়ন সহায়তা হারাবে। এই উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের প্রস্তুতি কেমন হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তাই দ্রুত এফটিএ ও পিটিএ চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।