বাংলার আলো
শিরোনাম

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জনগণের প্রত্যাশা রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন যাদের পরিচয় কেবল দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং দীর্ঘ সামাজিক আন্দোলনের সাথে তাদের জীবন গভীরভাবে যুক্ত, আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠিক তেমনই একজন মানুষ।

এনামুল হোসেন এনামুল হোসেন কবি ও লেখক 13 views
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জনগণের প্রত্যাশা রাষ্ট্রপতি

ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি একসময় শিক্ষক ছিলেন, অর্থনীতি পড়িয়েছেন, সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন; তারপর পৌর রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন, নির্বাচিত হয়েছেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান। সেখান থেকে জাতীয় সংসদ, রাষ্ট্রীয় মন্ত্রিসভা, বিএনপির মহাসচিব—শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট সংসদীয় ভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে পৌঁছেছেন বঙ্গভবনে।

১৯৯১ সালের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এ যেন দীর্ঘ এক নদীর যাত্রা—উৎসে পাহাড়ি ঝরনা, মাঝপথে পাথর, ঘূর্ণি ও খরস্রোতা, আর শেষে এসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রশান্ত এক মোহনা। কিন্তু রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসা আর রাষ্ট্রের মানুষের হৃদয়ে একজন অভিভাবক হয়ে ওঠা এক কথা নয়। পদ মানুষকে বড় করে; কিন্তু মানুষ পদকে বড় করে তোলেন তার আচরণ, ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও উদারতার মধ্য দিয়ে।

সেখানেই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি পারবেন? মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতি দিয়ে জীবন শুরু করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন; সরকারি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন।

 

একজন শিক্ষক যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন তার কাছে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার কাঠামো হওয়ার কথা নয়; রাষ্ট্র হওয়ার কথা মানুষের জীবন, শিক্ষার সুযোগ, সংস্কৃতির বিকাশ এবং ন্যায়বিচারের একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। এই জায়গাটিই মির্জা ফখরুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

তার ছাত্রজীবনের রাজনীতিও ছিল আন্দোলনমুখর। ষাটের দশকের শেষভাগে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন; এ সময় তিনি গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করেন। পরবর্তী সময়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৮৬ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অর্থাৎ তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল একটি পৌরসভা থেকে—রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ থেকে নয়। এই পথটিই তাকে বুঝিয়েছে, রাষ্ট্রের রাজনীতি আসলে মানুষের উঠোন থেকেই শুরু হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ থেকে তিনি আজ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

 

ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দলটির অন্যতম প্রধান মুখ। ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মধ্য দিয়েও তিনি দলটির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখেন।

২০২৬ সালের নির্বাচনে আবার ঠাকুরগাঁও-১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন।এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার পর তিনি বিএনপির সব দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এখানেই তার জীবনের এক আশ্চর্য বাঁক। যে মানুষটি একদিন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে স্থানীয় মানুষের কাছে জবাবদিহির রাজনীতি শুরু করেছিলেন, তিনিই আজ সংবিধানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে। তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

 

একজন শিক্ষক যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন তার কাছে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার কাঠামো হওয়ার কথা নয়; রাষ্ট্র হওয়ার কথা মানুষের জীবন, শিক্ষার সুযোগ, সংস্কৃতির বিকাশ এবং ন্যায়বিচারের একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। এই জায়গাটিই মির্জা ফখরুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

মির্জা ফখরুল ইসলামের ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক ও তুলনামূলকভাবে সংযত রাজনৈতিক প্রকাশভঙ্গি। কবিতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও জনপরিসরে এসেছে। তবে তাকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বা ‘সংস্কৃতিমনা’ হিসেবে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বাস্তব রেকর্ডকেও সামনে রাখতে হবে।

কারণ অসাম্প্রদায়িকতা কেবল কবিতা পাঠের সৌন্দর্যে প্রকাশ পায় না; প্রকাশ পায় মন্দিরে আগুন লাগলে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায়, সংখ্যালঘু নাগরিকের ভয়কে নিজের ভয় হিসেবে অনুভব করার মধ্যে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক না হয়—সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার মধ্যে।

একজন রাষ্ট্রপতির অসাম্প্রদায়িকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—তিনি কি মুসলমানের রাষ্ট্রপতি হবেন, হিন্দুর রাষ্ট্রপতি হবেন, বৌদ্ধের রাষ্ট্রপতি হবেন, খ্রিস্টানের রাষ্ট্রপতি হবেন, নাকি কেবল ‘বাংলাদেশি নাগরিকের রাষ্ট্রপতি’ হবেন? বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনায় উত্তরটি স্পষ্ট—রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের পরিচয় একটাই : নাগরিক। মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি বঙ্গভবন থেকে এই সত্যকে শুধু বক্তৃতায় নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে সেটিই।

একটি জাতির সংস্কৃতি যত মুক্ত, তার মনন তত গভীর।

যে দেশে কবিতা ভয় পায়, গান অনুমতির অপেক্ষায় থাকে, নাটক প্রশ্ন করতে ভয় পায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মত প্রকাশে সংকুচিত হন, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করলে তাকে শত্রু ভাবা হয়—সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগোলেও মানসিকভাবে মুক্ত হয় না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম একজন শিক্ষক ছিলেন। এই পরিচয় তার জন্য এক বিশেষ নৈতিক দায় তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মুক্তচিন্তার পরীক্ষাগার। সেখানে সরকারপন্থী যেমন কথা বলবে, বিরোধী মতও কথা বলবে। কেউ প্রশংসা করবে, কেউ সমালোচনা করবে। কেউ প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করবে। কেউ নতুন দর্শন হাজির করবে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় আনুগত্যের ক্ষেত্র না বানিয়ে মুক্তবুদ্ধি, গবেষণা, বিতর্ক ও সৃজনশীলতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে পারেন, তাহলে তার শিক্ষকসত্তা সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রনায়কসত্তায় পরিণত হবে। একজন শিক্ষক যখন রাষ্ট্রপতি হন, তখন দেশের শিক্ষকসমাজের প্রত্যাশাও একটু বেড়ে যায়। তারা দেখতে চান—বঙ্গভবনের মানুষটি কি শ্রেণিকক্ষের স্বাধীনতার ভাষা বুঝবেন?

সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিভাবক হওয়া—সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত সাংবিধানিক ও অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক। কিন্তু বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে উত্তাল দেশে রাষ্ট্রপতির নৈতিক ভূমিকা কখনোই কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ঐক্যের একটি প্রতীক। তাই মির্জা ফখরুল ইসলামের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।

তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব ছিলেন। দলীয় রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সৈনিক হিসেবে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। কিন্তু বঙ্গভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বদলে গেছে।

এখন তাকে প্রশ্ন করতে হবে না—‘কে বিএনপি?’ তাকে প্রশ্ন করতে হবে—‘কে বাংলাদেশ?’ বিএনপির কর্মী যেমন তার নাগরিক, তেমনি জামায়াতের সমর্থক, বামপন্থী, জাতীয় পার্টির সমর্থক, দলহীন মানুষ, সংখ্যালঘু, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, ব্যবসায়ী—সবাই তার রাষ্ট্রের মানুষ। রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় মহত্ত্ব এখানেই—তিনি দলীয় সীমানার ওপরে উঠে রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। যদি তিনি পারেন, তবে বঙ্গভবন হবে কেবল রাষ্ট্রপতির কার্যালয় নয়; হয়ে উঠতে পারে মানুষের আস্থার একটি নৈতিক ঠিকানা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি নতুন অধ্যায় নয়; এটি কোটি মানুষের প্রত্যাশারও একটি নতুন দরজা খুলেছে। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির কাছে অনেক কিছু চেয়েছে। কেউ চেয়েছে নিরাপত্তা, কেউ ন্যায়বিচার, কেউ সম্মান; কেউ চেয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কেউ চেয়েছে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।

কেউ চেয়েছে সন্তান যেন দলীয় পরিচয়ের কারণে নয়, মেধার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পায়; কেউ চেয়েছে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য; শ্রমিক চেয়েছে নিরাপদ কর্মপরিবেশ; তরুণ চেয়েছে কর্মসংস্থান; নারী চেয়েছে নিরাপত্তা ও মর্যাদা; সংখ্যালঘু নাগরিক চেয়েছে ভয়হীন জীবন। রাষ্ট্রপতির কাছে মানুষের প্রত্যাশা তাই সরাসরি উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র বদলে যাওয়ার প্রত্যাশা।